বাংলাদেশে টমেটো একটি অতি জনপ্রিয় শীতকালীন বা রবি মৌসুমের ফসল। এটি ফল জাতীয় পুষ্টিসমৃদ্ধ সবজি। কাঁচা ও পাকা উভয় অবস্থায় সালাদ হিসেবে খাওয়া যায় এবং সুস্বাদু। অন্য সবজির সঙ্গেও রান্না করা যায়। প্রক্রিয়াজাতকৃত টমেটো থেকে তৈরি স্যুপ, কেচআপ ও অন্যান্য খাদ্যসামগ্রী বর্তমানে সব দেশেই প্রিয় এবং বহুল প্রচলিত। কিন্তু এই জনপ্রিয় টমেটো আমাদের জন্য কতটুকু স্বাস্থ্যকর। টমেটোতে বিভিন্ন ধরনের পোকা ও রোগ আক্রমণ করে। বাংলাদেশের কৃষকরা এসব রোগ ও পোকা দমনের জন্য বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার করে থাকে। যেগুলো আমাদের শরীরে মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে এবং পরিবেশের যথেষ্ট ক্ষতিসাধন করে থাকে। প্রয়োগের সময় যথেষ্ট সতর্কতা না থাকায় কৃষকের শরীরে নানা ধরনের উপসর্গ দেখা দেয়, অনেক সময় তা স্থায়ীরূপ লাভ করে। ইতোমধ্যে পৃথিবীর অন্যান্য দেশে টমেটোর জৈবিকভাবে পোকা ও রোগ দমনে বিভিন্ন উপায় ও পদ্ধতি বের হয়েছে। বাংলাদেশেও টমেটোর জৈবিক পদ্ধতিতে পোকা ও রোগ দমন নিয়ে কাজ শুরু হয়েছে এবং কৃষকরা এ বিষয়ে উদ্বুদ্ধ হচ্ছে। টমেটো চাষাবাদে কীটনাশক প্রয়োগ না করে জৈবিক পদ্ধতিতে পোকা ও রোগ দমন বিষয়ে নিম্নে আলোকপাত করা হলো।বীজতলার মাটি শোাধন : বীজ বপনের পূর্বে বীজতলার মাটি শোধন করলে মাটিবাহিত রোগ ও পোকামাকড় দমন হয়। বীজতলার মাটি সৌরতাপ ব্যবহার করে (পলিথিন দিয়ে বীজতলা ঢেকে দেয়া), জলীয় বাষ্প ব্যবহার করে, কাঠের গুঁড়া পুড়িয়ে, পোল্ট্রি রিফিউজ ব্যবহার করে শোধন করা যায়। এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে সহজ ও কার্যকরী পদ্ধতি হলো সৌরতাপ ব্যবহার করে বীজতলার মাটি শোধন। এর জন্য বীজ বপনের ১২-১৫ দিন পূর্বে বীজতলার মাটি যথাযথভাবে তৈরি করে ভালোভাবে পানি দিয়ে ভিজিয়ে দিতে হবে। পরে ০.১ মিমি পুরু স্বচ্ছ পলিথিন দিয়ে বায়ু নিরোধক করে ২০ দিন ঢেকে রাখতে হবে। এতে সারা দিনের সূর্যালোকে পলিথিনের ভেতরে বীজতলার মাটির তাপমাত্রা যথেষ্ট বৃদ্ধি পাবে ও অনেকাংশে মাটিবাহিত রোগজীবাণু দমন করবে। এছাড়া অনেক ক্ষতিকারক পোকামাকড় ও আগাছা দমন হয়। কাঠের গুঁড়া পুড়িয়ে, সৌরতাপ ব্যবহার করে, পোল্ট্রি রিফিউজ ও খৈল ব্যবহার করে ড্যাম্পিং অফ রোগ থেকে চারাকে রক্ষা করা যায়।বীজ শোধন : বীজ বপনের ২৪ ঘণ্টা পূর্বে প্রতি কেজি বীজকে ঞৎরপযড়ফবৎসধ ারৎরফব ৪ গ্রাম বা চংবঁফড়সড়হধং ভষঁড়ৎবংপবহং ১০ গ্রাম দ্বারা শোধন করতে হবে। বীজ বপনের ঠিক পূর্বে প্রতি ৪০০ গ্রাম বীজকে ৪০ গ্রাম অুড়ংঢ়রৎরষষঁস দ্বারা শোধন করতে হবে। এরপর লাইনে ৪ সেমি পর পর ১৫ সেমি উঁচু বেডে বপন করে বালি দিয়ে ঢেকে দিতে হবে।

টমেটোর ফল ছিদ্রকারী পোকা : পাশাপাশি সারিতে ৪০ দিন বয়সের আমেরিকান গাঁদা ফুলের চারা এবং ২৫ দিন বয়সের টমেটোর চারা ১:১৬ অনুপাতে রোপণ করা। এতে পূর্ণাঙ্গ পোকা গাঁদা ফুলে ডিম পারবে এবং টমেটো ফল আক্রমণ থেকে রক্ষা পাবে। জমি লাঙ্গল দিয়ে চাষ করা যাতে পিউপা মাটির নিচ থেকে বের হয়ে এসে মারা যায়। জমিতে ঢালা সেচ দিয়ে হাইবারনেশনে যাওয়া পিউপাকে তাড়িয়ে দিতে হবে। প্রতিরোধী জাত চাষ করা যেমন : রোমা, পুষা রুবি। পোকা আক্রমণ করলে আক্রান্ত ফল, ডিমের কু-লী এবং বাড়ন্ত লার্ভাকে সংগ্রহ করে মেরে ফেলা। এক কেজি আধা ভাঙা নিম বীজ ১০ লিটার পানিতে ১২ ঘণ্টা ভিজিয়ে রেখে কাপড়ে ছেঁকে সপ্রে করা। দুই ধরনের ফল ছিদ্রকারী পোকা আছে যেমন হেলিকোভারপা আরমিজেরা ও স্পোডপটোরা লিটুরা। এই দুটি ধরনের পোকা দমনের জন্য ফেরোমন ফাঁদ প্রতি হেক্টর ১২টি হারে সেট করতে হবে এবং প্রতি ১৫ দিনে একবার পরিবর্তন করতে হবে। প্রতি হেক্টরে ১টি করে আলোর ফাঁদ ব্যবহার করেও এ পোকা দমন করা যায়। জমিতে ট্রাইকোগ্রামা প্যারাসিটয়েড ব্যবহার যেমন ঞৎরপযড়মৎধসসধ ঢ়ৎবঃরড়ংঁস হেক্টরে ১ লক্ষ অথবা ঞৎরপযড়মৎধসসধ পযরষড়হরং হেক্টরে ৫০ হাজার প্রতি সপ্তাহ অন্তর অন্তর গাছে ফুল বের হওয়ার পর ছাড়তে হবে। তবে এই হার ফসলের অর্থনৈতিক ক্ষতির শতকরা ১০ ভাগ হারের ওপর নির্ভর করবে। 
পাতা সুড়ঙ্গকারী পোকা (লিফ মাইনর) : আক্রান্ত পাতা সংগ্রহ করে ধ্বংস করা। আঠাল হলুদ ফাঁদ ব্যবহার করে এদের আকৃষ্ট করে মেরে ফেলা। নিমতেল ৫ মিলির সঙ্গে ৫ মিলি ট্রিকস প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে পাতায় স্প্রে করলে এ পোকার আক্রমণ হ্রাস পায়।জাব পোকা : সাবান পানি কীটনাশক যেমন ২ টেবিল চামচ সাবান গুঁড়া ১ লিটার পানিতে মিশাতে হবে। প্রয়োগের আগের দিন রাতে ৩টি রসুন কোয়া, ১টি পেঁয়াজ, ৩টি মরিচ ও পেঁয়াজের সমপরিমাণ আদা ভালো করে পিষিয়ে রাখতে হবে। প্রয়োগের আগে পিষানো যৌগ ওই ১ লিটার পানিতে মিশিয়ে প্রয়োগ করতে হবে। এটা জাব পোকা দমনে কার্যকর। তামাক পাতা কীটনাশক যেমন ১০০ গ্রাম তামাক পাতা ভালো করে পিষে নিয়ে ১-২ লিটার পানিতে মিশিয়ে ১২ ঘণ্টা রেখে দিতে হবে। তারপর কাপড়ে ছেঁকে নিয়ে এর সঙ্গে আরো ১ লিটার পানি মিশিয়ে জমিতে প্রয়োগ করতে হবে। 
সাদা মাছি পোকা : পূর্ণাঙ্গ পোকাকে আকৃষ্ট করার জন্য আঠালো হলুদ ফাঁদ হেক্টরে ১২টি হারে ব্যবহার করতে হবে। বিকল্প পোষক হিসেবে আগাছা তুলে ফেলতে হবে। পাতা কোঁকড়ানো গাছ তুলে ফেলা এবং ধ্বংস করা। জমির আগাছা পরিষ্কার রাখা। সঠিকভাবে সেচ প্রয়োগ করা। জমিতে প্যারাসিটয়েড যেমন ঊৎবঃসড়পবৎঁং সবংরর এবং প্রিডাটর যেমন পড়পপরহবষষরফং, ইৎঁসঁং এবং ঈযৎুংড়ঢ়বৎষধ ছেড়ে দেয়া। এক কেজি আধা ভাঙা নিম বীজ ১০ লিটার পানিতে ১২ ঘণ্টা ভিজিয়ে রেখে ওই পানি পাতার নিচের দিকে স্প্রে করা। বীজতলা মশারীর নেট (৫০ মেস) দিয়ে ঢেকে রাখা। তামাক পাতা কীটনাশক যেমন ১০০ গ্রাম তামাক পাতা ভালো করে পিষে নিয়ে ১-২ লিটার পানিতে মিশিয়ে সারা রাত রেখে দিতে হবে। পরদিন ছেঁকে নিয়ে এর সঙ্গে ১ লিটার পানি ও ১০ গ্রাম সাবান মিশিয়ে জমিতে প্রয়োগ করতে হবে। 
থ্রিপস পোকা : আক্রান্ত পাতা ও কা- সংগ্রহ করে ধ্বংস করা ও অধিক আক্রান্ত গাছ তুলে ফেলা। হেক্টরে ১৫টি আঠালো হলুদ ফাঁদ ব্যবহার করা যাতে পোকা আকৃষ্ট হয়ে আঠাতে লেগে থাকে এবং মারা যায়। তামাক পাতা কীটনাশক ব্যবহার করেও এ পোকা দমন করা যায়।
ড্যাম্পিং অফ রোগ : জমিতে পানি যেন দাঁড়িয়ে না থাকে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। সুস্থ চারা পেতে উঁচু বীজতলা তৈরি করা। রৌদ্রোজ্জ্বল জায়গায় বীজতলা তৈরি এবং নিয়মিত সেচ দেয়া।
ঢলে পড়া রোগ : বীজতলা তৈরির পূর্বে মাটি সোলারাইজেশন করে নিতে হবে। চংবঁফড়সড়হধং ভষঁড়ৎবংপবহং (চঋ) ১০ গ্রাম দ্বারা প্রতি কেজি বীজ শোধন করে নিতে হবে এবং বীজ তলায় প্রতি বর্গমিটারে ২০ গ্রাম এবং লাগানোর পূর্বে ৫ গ্রাম প্রতি লিটারে তৈরি দ্রবনে চারা চুবিয়ে নিতে হবে এবং চারা রোপণের ৩০ দিন পর ২.৫ কেজি ৫০ কেজি জৈব সারের সঙ্গে মিশিয়ে প্রতি হেক্টর জমিতে প্রয়োগ করে ঢলে পড়া রোগ দমন যায়। শস্য পর্যায় অবলম্বন করা যেমন কাউপি-ভুট্টা-বাঁধাকপি, ঢ়েঁড়শ-কাউপি-ভুট্টা, ভুট্টা-কাউপি-ভুট্টা। আক্রান্ত গাছ দেখা মাত্র তুলে ফেলা। আন্তজার্তিক সবজি কেন্দ্র, তাইওয়ান কতৃক উদ্ভাবিত বেগুন (ইজি-২০৩) এর সঙ্গে টমেটোর জোড় কলম প্রযুক্তি ব্যবহার করেও ঢলে পড়া রোগ দমন করা যায়।
টমেটোর হলুদ পাতা কোঁকড়ানো ভাইরাস রোগ : এই ভাইরাস বাহক পোকা যেমন সাদা মাছি দ্বারা ছড়ায়। রোগের প্রকোপ কমানোর জন্য বাহক পোকার সংখ্যা কমাতে হবে। প্রতি হেক্টর জমিতে ১২টি হলুদ আঠালো ফাঁদ ব্যবহার করে বাহক পোকা দমন করা যায়। টমেটো জমির চতুর্দিকে বেরিয়ার বা বাধাদানকারী ফসলের চাষ করা যাতে বাহক পোকা সহজে টমেটোতে আক্রমণ না করে। ক্ষুদ্র ছিদ্রযুক্ত (প্রতি বর্গইঞ্চিতে ৪০-৫০টি ছিদ্র) নাইলনের নেট দিয়ে বীজতলা ঢেকে চারা উৎপাদন করতে হবে যাতে বাহক পোকা চারা অবস্থায় রস চুষে খেতে না পারে। চারা লাগানোর ৪৫ দিন পর্যন্ত জমিতে ভাইরাস আক্রান্ত গাছ তুলে ধ্বংস করা। আগাছা দমন বা মাটি তোলার সময় ভাইরাসের বিকল্প উৎস বা পোষক তুলে ফেলা এতে এ রোগ কম ছড়াবে। 
টমেটো স্পটেট উইল্ট ভাইরাস রোগ : এ রোগ বাহক পোকা যেমন থ্রিপস দ্বারা ছড়ায়। আক্রান্ত গাছ তুলে ফেলে পুড়িয়ে ফেলা অথবা মাটি চাপা দেয়া। টমেটো লাগানোর পূর্বে জমির চতুর্দিকে বেরিয়ার ফসল যেমন সরগম, ভুট্টা এবং বাজরা ৫-৬ সারি রোপণ করে এ রোগ দমন করা যায়। ভাইরাসের বিকল্প উৎস বা হোস্ট তুলে ফেলা এতে এ রোগ কম ছড়াবে।
টমেটো মোজাইক ভাইরাস (টিএমভি) রোগ : রোগমুক্ত গাছ থেকে বীজ সংগ্রহ করে বপন করা। বীজ ভালো করে পরিষ্কার করে ছায়ায় শুকিয়ে নিতে হবে। বীজতলার সমস্ত ভাইরাস আক্রান্ত গাছ তুলে ফেলা এবং ধ্বংস করা। কোনো আক্রান্ত চারা মূল জমিতে লাগানো যাবে না। তামাক, আলু, মরিচ, ক্যাপসিকাম ও বেগুন ছাড়া অন্য ফসল দ্বারা শস্য পর্যায় অবলম্বন করতে হবে।
নেমাটোড রোগ : নেমাটোড দমনের জন্য মাটি ও বীজ শোধন করা হয়। মাটি শোধন করতে প্রতি হেক্টরে ২.৫ কেজি ইধপরষষঁং ংঁনঃরষরং (ইনঠ ৫৭) অথবা চংবঁফড়সড়হধং ভষঁড়ৎবংপবহং প্রয়োগ করতে হবে। বীজ শোধনের জন্য প্রতি কেজি বীজে ১০ গ্রাম মিশাতে হবে। তরল অবস্থায়ও ইধপরষষঁং ংঁনঃরষরং (ইনঠ ৫৭) অথবা চংবঁফড়সড়হধং ভষঁড়ৎবংপবহং প্রয়োগ করা যায় এবং টমেটোর জন্য ১০০০ মিলি প্রতি হেক্টরে ড্রিপ সেচের মাধ্যমে প্রয়োগ করে নেমাটোড দমন করা যায়। 
আগাম ধসা বা আর্লি বস্নাইট রোগ : আক্রান্ত গাছ তুলে ফেলে ধ্বংস করা। রোগের প্রকোপ কমানোর জন্য শস্য পর্যায় অবলম্বন করা। ফসলের অবশিষ্টাংশ তুলে পুড়ে ফেলা। যেখানে এ রোগ নিয়মিত ও বেশি হয় সেখানে রোপণ সময় পরিবর্তন করে সম্ভব হলে শুষ্ক মৌসুমে এ ফসল চাষ করা। রোগমুক্ত গাছ বা উৎস থেকে সংগৃহীত বীজ ব্যবহার করা। পাতা বেশি সময় ধরে ভেজা থাকলে এ রোগের জীবাণু বৃদ্ধি পায়। তাই ঝরণা সেচ না দেয়া।
r