কৃষিই কৃষ্টি। বাংলাদেশের ৮০ ভাগের বেশী মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির উপর নির্ভরশীল। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের কৃষির উন্নয়ন অবশ্যই প্রশংসনীয়। জিডিপিতে কৃষির অবদান উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষনা প্রতিষ্ঠান, বাংলাদেশ ধান গবেষণা প্রতিষ্ঠান সহ বিভিন্ন কৃষি উন্নয়ন প্রতিষ্ঠানে কৃষিবিদদের নিরলস পরিশ্রমের ফলে আমরা পেয়েছি অধিকাংশ ফসলের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক উন্নত ফলনশীল জাত। এর ফলে বেড়েছে ফসলের উৎপাদন ক্ষমতা এবং দেশের মোট খাদ্য উৎপাদন।

বর্তমানে যেভাবে সরকারী এবং বেসরকারীভাবে কৃষির উপর গুরুত্ব প্রদান করা হচ্ছে তাতে আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই বাংলাদেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্নতা অর্জন করবে ইনশাল্লাহ।

যদিও আমাদের কৃষি আমার মতে সঠিক পথেই এগোচ্ছে, কিন্তু কথা হলো আগামী দিনে কেমন হবে আমাদের কৃষি। আমাদের কৃষি উৎপাদন কি দিন দিন বাড়তেই থাকবে? বিজ্ঞান সম্মত উত্তর হবে বাড়তেই থাকবে না কিন্তু আরো উৎপাদন বৃদ্ধি করা সম্ভব। কেননা আমাদের ফসলের জাত সমূহের উৎপাদন ক্ষমতা উপযুক্ত পরিবেশে আরো বেশি। প্রশ্ন এখানেই যে, আমরা চাষাবাদের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ কি ধরে রাখতে পারব? প্রতিবছর কৃষি জমি উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পাচ্ছে বাড়ি-ঘর ও শিল্প কারখানা নির্মানের জন্য। নিবিড় চাষাবাদের ফলে আমাদের মাটির উর্বরতা ও উৎপাদন ক্ষমতা আশংকাজনক হারে কমে যাচ্ছে। চাষযোগ্য জমিতে লবনাক্ততা বাড়ছে দিন দিন। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব পড়ছে কৃষির উপর, ফলে উৎপাদন দিন দিন কমছে। এসব সমস্যার বাহিরে যে সমস্যা আমাদের জন্য অদূর ভবিষ্যতে প্রকট হয়ে দাড়াবে তা হলো আর্সেনিক বিষাক্ততা।

সুতরাং পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে কৃষিবিদদের দুটি চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে। এর মধ্যে একটি হলো আরো উচ্চ ফলনশীল জাত উদ্ভাবনের মাধ্যমে ক্রমাগত বৃদ্ধিরত জনসংখ্যার জন্য খাদ্যের যোগান দেয়া এবং পরিবর্তিত বিরূপ পরিবেশে কৃষিকে খাপ খাওয়ানো।

জমিতে ফসল ফলানোর জন্য শতকরা ৫ ভাগ জৈব পদার্থ থাকা জরুরী। কিন্তু আমাদের দেশের অধিকাংশ জমিতে এর পরিমাণ মাত্র শতকরা ২ ভাগ এর কাছাকাছি। এছাড়াও আমাদের মাটিতে গাছের বিভিন্ন খাদ্য উৎপাদন এর পরিমাণ আশংকাজনক হারে কমে গেছে। ৯০ এর দশকে আমাদের জমিতে মাইক্রো নিউট্রিয়েন্ট সার প্রয়োগ করার প্রয়োজন ছিল না, কিন্তু এখন আমাদের জিংক, বোরন সার জমিতে প্রয়োগ করতে হচ্ছে এবং আশংকা করা হচ্ছে যে, অদূর ভবিষ্যতে মাটি থেকে গ্রহণকৃত ১৪টি খাদ্য উৎপাদনের অধিকাংশ সার হিসেবে প্রয়োগ করতে হবে। এর ফলে আমাদের জমির উৎপাদন ক্ষমতা কমে যাবে।

বাংলাদেশের ২০ ভাগ অঞ্চল উপকূলীয় এবং দেশের চাষযোগ্য জমির ৩০ ভাগ এই উপকূলীয় অঞ্চলে। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো যে, আমাদের অধিকাংশ উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততার পরিমান দিন দিন বাড়ছে। ফলে এসব অঞ্চলে উৎপাদন ব্যহত হচ্ছে। উপকূলীয় অধিকাংশ অঞ্চলে শুধুমাত্র কিছু স্থানীয় লবণাক্ততা সহিষ্ণু জাত বছরে একবার চাষ করা হয়। ফলে আশানুরুপ ফলনও পাওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

এসব কিছু ছাড়িয়ে আর্সেনিক বিষাক্ততা আমাদের কৃষির জন্য। স¤প্রতি এক গবেষনা সমীক্ষায় বলা হয়েছে যে, বাংলাদেশের ৬১টি জেলায় আর্সেনিক পাওয়া গেছে। অপরিকল্পিতভাবে ভুগর্ভস্থ পানি উত্তোলন এই আর্সেনিক দূষণের প্রধান কারণ। কৃষিবিদদের জন্য চিন্তার কারণ হলো যে, আর্সেনিক দূষিত পানি দ্বারা যে সকল ফসলে সেচ প্রদান করা হয় সেসব ফসলের খাদ্যপোযোগী অংশে থাকে আর্সেনিকের উপস্থিতি।

আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা প্রতিষ্ঠান (ইরি) এর গবেষণায় বাংলাদেশের অধিকাংশ ধানে (ব্রি ধান জাত ছাড়া) আর্সেনিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। ধান গাছের মূলে সবচেয়ে বেশি জমা এই বিষ এবং ক্রমান্বয়ে কান্ড, পাতা ও দানায় এর পরিমাণ কমতে থাকে এবং আর্সেনিক আক্রান্ত ধান গাছের খড় গবাদি পশু খাওয়ার ফলে এসব পশুর মাংস ও দুধে আর্সেনিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। দেশের উত্তরাঞ্চলে মরুকরণ শুরু হয়েছে এবং কৃষি উৎপাদনে এর বিরূপ প্রভাব পড়ছে।

আমরা কৃষিবিদরা আশাবাদী যে, আমরা সাফল্যের সঙ্গে এসব সমস্যা মোকাবেলা করে আমাদের কৃষিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবো। ইতোমধ্যে আমরা কিছু লবনাক্ততা ও খরা সহিষ্ণু জাত উদ্ভাবন করেছি এবং ভবিষ্যতে আরো নতুন জাত উদ্ভাবিত হবে ইনশাল্লাহ। আমাদের মনোনিবেশ করতে হবে খরা, লবণাক্ততা ও বন্যা প্রতিরোধী ফসলের জাত উদ্ভাবনে যেসব কারনে আর্সেনিক বিষ জমা হবে না।

অতি সমপ্রতি আমরা পাটের জিনোম আবিষ্কার করেছি। এ থেকে প্রতীয়মান হয়ে যে, গবেষণা ক্ষেত্রে বাংলাদেশ পিছিয়ে নেই। কিন্তু এসব সমস্যা মোকাবেলায় সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সরকারের কৃষি বান্ধব নীতিমালা এবং গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের বরাদ্দ নিশ্চিত করা। আমার বিশ্বাস প্রয়োজনীয় সকল সুযোগ সুবিধা পেলে আমাদের কৃষি গবেষকরা এসব সমস্যা সাফল্যের সাথে মোকাবেলা করে কৃষিকে আমাদের কাঙ্খিত লক্ষ্যে এগিয়ে নিয়ে যাবেন।

সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো মানসম্মত কৃষিবিদ তৈরী করার মাধ্যমে এই অনগ্রসর সিলেট অঞ্চলকে কৃষিতে অগ্রসর করা। আমি বিশ্বাস করি আমাদের তরুণ কৃষিবিদরা এই চ্যালেঞ্জ নিতে প্রস্তুত এবং তারা তাদের অর্জিত জ্ঞান দ্বারা এই অঞ্চলের অনাবাদী জমিকে চাষের আওতায় নিয়ে আসবে এবং দেশের কৃষি উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখবে।