২৬ অক্টোবর ১৫।। চতুর্দিকে সাগর বেষ্টিত পাহাড় সমৃদ্ধ অনন্য বৈশিষ্টের দ্বীপ কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলা। এদ্বীপের উৎপাদিত ফসলের মধ্যে ধান,পান,লবণ ও চিংড়ি জাতীয় অর্থনীতিতে উল্লেখ্যযোগ্য অবদান রাখতে সক্ষম।

এখানকার উৎপাদিত মিষ্টি পানের সুনাম দেশ বিদেশে সমাদৃত। এ দ্বীপে প্রতি বছর মৌসুম অনুসারে দু’ধরণের পান চাষ হয়ে থাকে। বর্ষা মৌসুমে পাহাড়ি এলাকায় এবং শুষ্ক মৌসুমে নীচু ও সমতল এলাকার ধান চাষের জমিতেও পান চাষ করা যায়। এ দু’টি পদ্ধতিকে বিল বরজ ও পাহাড়ি বরজ নামে অভিহিত করা হয়। চলতি বছরের শুস্ক মৌসুম থেকে সমতল ভূমিতে মিষ্টি পান চাষে শুরু হয়েছে নয়া বিপ্লব। পান চাষিরা শুধুমাত্র তাদের বংশপরম্পরায়ের চাষ পদ্ধতিগতভাবে পান চাষের বাইরে গিয়ে এখন থেকে শুরু করেছে বাণিজ্যিকভাবে পান চাষ। চাষিরা বেশি পুঁজি বিনিয়োগ করে দিন দিন বেশি পরিমাণে পান চাষ করে বাণিজ্যিক ভাবে লাববান হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে পানের দামও পাচ্ছে কাঙ্খিত ভাবে।

মহেশখালী উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছেমহেশখালীতে প্রায় ১ হাজার ৫শ হেক্টর জমিতে পান চাষ হচ্ছে। তার মধ্যে সমতল ভূমির কৃষি জমিতে বিল বরজ ১শত ৫০ হেক্টর ও পাহাড়ি বরজ ১৩শ ৫০ হেক্টর। প্রতি হেক্টর জমিতে ৬টি পানের বরজ করা যায়।

সে অনুপাতে এবছর মহেশখালীর পাহাড়ী ও সমতল ভূমি এলাকায় প্রায় ৯ হাজার পানের বরজের চাষ করেছে বলে চাষীদের সূত্রে জানা গেছে। এ ৯ হাজার পান বরজ নিয়ে দ্বীপের প্রায় ২০ হাজার পানচাষীর কর্ম সংস্থান হয়েছে। পান চাষি ও সংশ্লিষ্টদের মতে এক হেক্টর জমিতে পান চাষ করতে চাষীদের খরচ লাগে ৬ লাখ ৫৫ হাজার টাকা। বছরে প্রতি হেক্টর জমিতে অনুমান ১শ ৭ মে.টন পান উৎপাদন হয়। প্রতি হেক্টরে পান বিক্রি হয় প্রায় ১৬ লাখ ১২ হাজার ৫শ টাকা। এতে চাষীরা খরচ বাদ দিয়ে লাভবান হন প্রতি হেক্টরে প্রায় ৯ লাখ ৫৭ হাজার টাকা। প্রতি বছর মহেশখালী থেকে ১ লক্ষ ৬৩ হাজার ৫শ মে.টন পান বাইরে রপ্তানি হচ্ছে। মৌসুম পান চাষের অনুকূলে থাকলে চলতি বছর ২লাখ মেঃটন পান বিদেশে রপ্তানি করা যাবে বলে পান চাষিদের আশাবাদ।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছেযুগ যুগ ধরে উপজেলার বড়মহেশখালীহোয়ানককালারমারছড়াছোটমহেশখালী ও শাপলাপুর ইউনিয়নের পাহাড়ের ঢালু ও আবাদি কৃষি জমিতে পান চাষ করে আসছে স্থানীয় পান চাষীরা। পাহাড়ি এলাকায় পান চাষের স্থায়িত্ব দুই থেকে চার বছর হলেও কৃষি জমিতে পান চাষের স্থায়িত্ব মাত্র ৬ মাস।

কৃষি জমিতে পান চাষ অক্টোবর/নভেম্বর মাস থেকে শুরু হয়ে তা মে মাসে শেষ হয়। আর পাহাড়ি এলাকায় পান চাষ যে কোন সময়ে করা যায় বলে স্থানীয় কৃষকরা জানিয়েছেন। পানের বরজ থেকে পান তুলে নিয়ে চাষীরা স্থানীয় হাট বাজারে নিয়ে তা বিক্রি করছে। উপজেলার গোরকঘাটাবড় মহেশখালী ইউনিয়নের নতুন বাজারহোয়ানক ইউনিয়নের টাইম বাজারপানিরছড়া বাজারকালারমারছড়া ইউনিয়নের কালারমারছড়া বাজারজনতা বাজার ও শাপলাপুর বাজারে পানের বাজার বসে। সপ্তাহে দুই দিন এসব পান বাজারে পান বিক্রি হচ্ছে।

সম্প্রতি পানের হাট জনতা বাজার গিয়ে দেখা যায়পান বেচাকেনা করতে শতাধিক চাষী পান নিয়ে বাজারে বসেছে। বাজারে চট্টগ্রামবাঁশখালীচকরিয়াসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা পান ব্যবসায়ীরা চাষীদের কাছ থেকে পান কিনে নিচ্ছে। পরে এসব পান ট্রাক ভর্তি করে ব্যবসায়ীরা চট্টগ্রাম সহ বিভিন্ন এলাকায় নিয়ে যাচ্ছে। বাঁশখালী থেকে আসা পান ব্যবসায়ী রুহুল কাদের জানানসপ্তাহের দুই দিন মহেশখালী উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় পানের হাট বসে। এসব পানের হাট থেকে চাষীদের কাছ থেকে পান সংগ্রহ করা হয়। পরে ওই সব পান গুলো চট্টগ্রাম সহ বিভিন্ন এলাকায় নিয়ে গিয়ে বিক্রি করি। গত দুই সপ্তাহ ধরে পানের ন্যায্য দাম পাওয়ায় মহেশখালীর পান চাষীরা খুশি বলে তিনি জানিয়েছেন।

শাপলাপুর ইউনিয়নের জেমঘাট এলাকার পানচাষী আবুল কালাম(৪৫)বলেনগত দু’তিন মাস আগে পানের বাজারে পানের মূল্যে ধস নামেন। এ কারণে এ বছর পান চাষে লাভতো দূরের কথা লোকসান গুনতে হবে বলে মনে করেছিলাম। কিন্তু দুই সপ্তাহ ধরে পান বাজারে পানের মূল্য এক লাফে অনেক বেড়ে যায়। গত মাসে এক বিরা পানের দাম ছিল মাত্র ৭০ টাকা। এখন সেই পান বিক্রি হচ্ছে প্রতি বিরা ২শ ২০ টাকা থেকে আড়াইশ টাকা পর্যন্ত। ফলে পানের মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় চাষীরা অনেক লাভবান হবেন বলে তিনি জানান।

কালারমারছড়া ইউনিয়নের ঝাপুয়া এলাকার পান চাষী আব্দুল নবী(৪৫),রহিম উল্লাহ (৪৩ও মনির হোসেন (৫০)জানানকৃষি জমিতে অক্টোবর মাসে পান চাষ করার শুরুতেই অতি বৃষ্টির কারণে পানের বরজ নষ্ট হয়ে যায়। এতে পান চাষীরা একটি পানের বরজে প্রায় ৫০ হাজার টাকা ক্ষতিগ্রস্তের সম্মুখিন হয়। কিন্তু দুই সপ্তাহ ধরে পানের দাম বেড়ে যাওয়ায় লোকসান কাঠিয়ে উঠায় চাষীদের মুখে হাঁসি ফুটে উঠেছে। চাষীরা জানানআগামী বিল বরজের মৌসুম থেকে পান চাষিদের সরকারীভাবে ব্যাংক ঋণের সহায়তা করা হলে পান চাষ করে চাষিরা দেশের অর্থনীতিতে আরো জোরালো ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।
সূত্রঃ দৈনিক আজাদী

r