বন্যা পরবর্তী সময়ে ফসল রক্ষায় কৃষক ভাইদের করণীয়


আবহমানকাল ধরে বন্যা, ঘূর্নিঝড়, জলোচ্ছাস, টর্নেডো, জলাবদ্ধতা, অতিবৃষ্টি, খরা, নদীভাঙ্গন, শিলাবৃষ্টি, ভূমিকম্প, ইত্যাদি আপদ বাংলাদেশের নিত্য সহচর। হিমালয়ের পাদদেশে অবস্থিত প্রধানতম সমতল পৃথিবীর এ বৃহত্তম ব-দ্বীপের অবস্থান এমন এক স্থানে যেখানে উজানে হিমালয় সন্নিহিত অঞ্চলে কিছুটা বেশী বৃষ্টি হলে এখানে বন্যা হয়। অন্যদিকে আন্দামান সংলগ্ন বঙ্গোপসাগরের বুকে নিম্নচাপ সৃষ্টি হলে তা ঘূর্নিঝড়ের আকারে দেশের উপকূলীয় অঞ্চলে আঘাত হানে এবং এর ফলে সারা দেশে অতিবৃষ্টি ও বন্যার সৃষ্টি হয়। চলতি আমন মওসুমে দেশের যেসব অঞ্চল বন্যা আক্রান্ত হয়েছে সে সমস্ত এলাকায় বেশিরভাগ বীজতলার চারা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। চলমান আমন ধানের চাষ যাতে বিঘিœত না হয় সে জন্য বন্যা পরবর্তী সময়ে কৃষক ভাইদের জরুরি করণীয় সম্পর্কে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উল্লেখ করা হলো- 


১) বীজতলা

যেসব এলাকায় বীজতলা করার উঁচু জমি নেই সে সমস্ত এলাকায় ভাসমান বীজতলা এবং দাপোগ বীজতলায় চারা উৎপাদনের পদক্ষেপ নিতে হবে। ভাসমান বীজতলার ক্ষেত্রে কচুরিপানা ও মাটি দিয়ে কলার ভেলায় ভাসমান বীজতলা করা যেতে পারে। দাপোগ বীজতলার ক্ষেত্রে বাড়ির উঠান বা যেকোন শুকনো জায়গায় কিংবা কাদাময় সমতল জায়গায় পলিথিন, কাঠ বা কলাগাছের বাকল দিয়ে তৈরি চৌকোনা ঘরের মত করে প্রতি বর্গমিটারে ২-৩ কেজি অঙ্কুরিত বীজ ছড়িয়ে দিতে হবে। এভাবে করা বীজতলা থেকে ১৪-১৫ দিন বয়সের চারা জমিতে রোপণ করতে হবে। যে সমস্ত এলাকা বন্যায় আক্রান্ত হয়নি সে সব এলাকায় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে প্রয়োজনীয় পরিমাণ বীজতলা তৈরির ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে যাতে বন্যার পানি নামার সঙ্গে সঙ্গে চারা বিতরণ কার্যক্রমের মাধ্যমে আমন ধানের আবাদ নির্বিঘœ করা যায়। 


২) ধানের জাত নির্বাচন

বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর স্বল্প জীবনকালীন জাত যেমন- ব্রি ধান ৩৩, ব্রি ধান ৫৬, ব্রি ধান ৫৭, ব্রি ধান ৬২, ব্রি ধান ৭১ ও ব্রি ধান ৭৫ সরাসরি ২৫ আগস্ট পর্যন্ত রোপণ করা যেতে পারে। এছাড়াও ব্রি উদ্ভাবিত আলোক সংবেদনশীল উফশী জাত যেমন- বিআর ৫, বিআর ২২, বিআর ২৩, ব্রি ধান ৩৪, ব্রি ধান ৪৬ জাতসমূহ ১৫ আগস্টের মধ্যে বীজতলায় চারা উৎপাদন করে ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত রোপণ করা যাবে। সরাসরি বপনের সময় ৩০ আগষ্ট পর্যন্ত। স্থানীয় জাত যেমন-নাইজারশাইল ও গাইঞ্জাসহ স্থানীয় জাতসমূহ ১৫ সেপ্টেম্বর এর মধ্যে রোপণ বা সরাসরি বপনের ক্ষেত্রে ৩০ আগস্টের মধ্যে বপন করতে হবে।


৩) বাড়ন্ত আমন ধানের গাছের যতœ

বন্যায় আক্রান্ত হয়নি এমন বাড়ন্ত আমন ধানের গাছ (রোপণের ৩০-৪০ দিন পর্যন্ত) থেকে ২-৩ টি কুশি রেখে বাকি কুশি সযতেœ শিকড়সহ তুলে নিয়ে সাথে সাথে অন্য ক্ষেতে রোপণ করা যেতে পারে। বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর নাবীতে রোপণের ক্ষেত্রে প্রতি গোছায় একটু বেশি করে চারা দিয়ে (৪-৫ টি) এবং ঘন করে (২০ দ্ধ ১৫ সে.মি. দূরত্বে) রোপণ করতে হবে। 


৪) নাবিতে বপনের ক্ষেত্রে জমিতে সার প্রয়োগ পদ্ধতি

বন্যার পানিতে আসা পলির কারণে জমি উর্বর হয়। এ জন্য বিলম্বে রোপণের ক্ষেত্রে দ্রুত কুশি উৎপাদনের জন্য সুপারিশকৃত দুই-তৃতীয়াংশ ইউরিয়া, টিএসপি, এমওপি, জিপসাম সার জমি তৈরির সময় প্রয়োগ করতে হবে। অবশিষ্ট এক তৃতীয়াংশ ইউরিয়া রোপণের ২০-২৫ দিনের মধ্যে প্রয়োগ করতে হবে। নাবিতে বপনের ক্ষেত্রে ধানের স্বাভাবিক ফলন নিশ্চিত করার জন্য খরায় আক্রান্ত হলে প্রয়োজন অনুযায়ী সম্পূরক সেচের ব্যবস্থা করতে হবে। 


৫) আংশিক বন্যায় আক্রান্ত বীজতলায় ব্যাকটেরিয়াজনিত পাতা পোড়া রোগ দেখা দিতে পারে। সে ক্ষেত্রে চারা একটু সোজা হয়ে উঠলে ৬০ গ্রাম থিওভিট, ৬০ গ্রাম পটাশ সার ও ২০ গ্রাম জিংক সার ১০ লিটার পানিতে মিশিয়ে প্রতি ৫ শতাংশ জমিতে স্প্রে করতে হবে। 


৬) ধানের ফুল পর্যায়ে বিশেষ করে সুগন্ধি জাতে শীষ ব্লাস্ট রোগের প্রাদুর্ভাব হতে পারে। সেক্ষেত্রে থোড় অবস্থার শেষ পর্যায়ে ট্রাইসাইক্লাজল ও স্ট্রবিন গ্রুপের ছত্রাকনাশক যেমন: ট্রুপার ও নেটিভো ৭-১০ দিন ব্যবধানে দুই বার বিকাল বেলায় অনুমোদিত মাত্রায় প্রয়োগ করতে হবে। 


৭) বন্যা পরবর্তী সময়ে ধান ক্ষেতে মাজরা, পাতা মোড়ানো এবং পামরি পোকার আক্রমণ হতে পারে। এ ক্ষেত্রে সমন্বিত বালাই দমন ব্যবস্থাপনা যেমন- হাত জাল, পার্চিং, আলোক ফাঁদ এবং অনুমোদিত কীটনাশক যেমন- মাজরা পোকার জন্য ভিরতাকো, পাতা মোড়ানো পোকার জন্য সেভিন/মিপসিন, পামরি পোকার জন্য ডার্সবান/সেভিন অনুমোদিত মাত্রায় ব্যবহার করতে হবে। বন্যা পরবর্তী সময়ে যে সব এলাকায় জলাবদ্ধতা থাকবে সেখানে বাদামী গাছ ফড়িং বা কারেন্ট পোকার আক্রমণের সম্ভাবনা বেশি। এ ক্ষেত্রে নিয়মিত মাঠ পরিদর্শন করতে হবে এবং পোকার উপস্থিতি থাকলে আলোক ফাঁদ বা মিপসিন/প্লিনাম/সপসিন/এ্যাডমায়ার অনুমোদিত মাত্রায় ব্যবহার করতে হবে।


সূত্রঃ বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট ওয়েবসাইট।