বঙ্গবন্ধু গভীরভাবে বিশ্বাস করতেন, কৃষির উন্নতি ছাড়া এদেশের মানুষের মুক্তি আসতে পারে না। ক্ষুধা নিবারণের প্রধান উপাদানের জোগানদাতাদের তিনি সর্বদাই সর্বোচ্চ স্থান দিয়েছেন। বঙ্গবন্ধু যেমন তাদের ভালোবেসেছেন, তেমনি তাদের ভালোবাসাও পেয়েছেন সর্বক্ষণ। মুক্তিযুদ্ধের সময় দেশমাতৃকার মান অক্ষুণ্ন রাখতে কৃষকরাও লাঙ্গল ছেড়ে হাতে নিয়েছিল অস্ত্র। কৃষকদের প্রতি ভালোবাসার টান ছিল বলেই তিনি তাদের মঙ্গলের জন্য কাজ করে গেছেন নিবিড়ভাবে। বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কৃষক, শ্রমিকসহ মেহনতি মানুষের স্বার্থ রক্ষার বিষয়টিই সর্বোচ্চ গুরুত্ব পেয়েছে


আজ ১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবস। ১৯৭৫ সালের এ দিনে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে তাঁর পরিবারের বেশিরভাগ সদস্যদের সঙ্গে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। আজকের এই দিনে আমি গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং ঐ দিনে শাহাদাত বরণকারী তাঁর পরিবারের সদস্যসহ সকল শহিদদের। কৃষি অর্থনীতির একজন ছাত্র হিসেবে আজকের এ দিনে মাত্র সাড়ে তিন বছরের শাসনামলে কৃষিখাতে জাতির পিতা যে অবদান রেখে গেছেন, তার কিয়দাংশ তুলে ধরার চেষ্টা করছি।

কৃষিখাতের উন্নয়নের সঙ্গে বিপুল জনগোষ্ঠীর খাদ্যনিরাপত্তা, কর্মসংস্থান ও জীবনযাত্রার মান সম্পর্কিত। এখনো দেশের মোট কর্মসংস্থানের ৪০ শতাংশের উত্স আমাদের কৃষিখাত। সাম্প্রতিক সময়ে কৃষিখাতে উন্নয়নের কারণে বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। গত পাঁচ বছরে দেশে দারিদ্র্যের হার ১০ শতাংশ কমানোর ক্ষেত্রেও কৃষি উত্পাদন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও), আন্তর্জাতিক খাদ্যনীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান (IFPRI) এবং বিশ্বব্যাংকের বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। IFPRI-এর ক্ষুধা নিবারণ সূচকে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে ভালো অবস্থানে আছে বাংলাদেশ। মাত্র এক বছরেই এই সূচকে ১১ ধাপ এগিয়েছে বাংলাদেশ। স্বাধীনতার পর থেকে গত প্রায় পাঁচ দশকে কৃষি জমি আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পেলেও শস্য উত্পাদন বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় চার গুণ। বাংলাদেশের কৃষিখাতে এসব সাফল্যের পেছনে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কৃষিভাবনা মূলশক্তি হিসেবে কাজ করেছে।

বঙ্গবন্ধু গভীরভাবে বিশ্বাস করতেন, কৃষির উন্নতি ছাড়া এদেশের মানুষের মুক্তি আসতে পারে না। ক্ষুধা নিবারণের প্রধান উপাদানের জোগানদাতাদের তিনি সর্বদাই সর্বোচ্চ স্থান দিয়েছেন। বঙ্গবন্ধু যেমন তাদের ভালোবেসেছেন, তেমনি তাদের ভালোবাসাও পেয়েছেন সর্বক্ষণ। মুক্তিযুদ্ধের সময় দেশমাতৃকার মান অক্ষুণ্ন রাখতে কৃষকরাও লাঙ্গল ছেড়ে হাতে নিয়েছিল অস্ত্র। কৃষকদের প্রতি ভালোবাসার টান ছিল বলেই তিনি তাদের মঙ্গলের জন্য কাজ করে গেছেন নিবিড়ভাবে। বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কৃষক, শ্রমিকসহ মেহনতি মানুষের স্বার্থ রক্ষার বিষয়টিই সর্বোচ্চ গুরুত্ব পেয়েছে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সারাজীবন তন্নতন্ন করে খুঁজে বেড়িয়েছেন স্বদেশকে। সার্বিক মুক্তির

লক্ষ্যে স্বাধীনতা আন্দোলনকে পরিচালনা করেই তিনি তাঁর দায়িত্ব শেষ করেননি, মুক্তিযোদ্ধা কৃষক সন্তানদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত বাংলাদেশ পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েও সর্বক্ষণ মনে রেখেছেন কৃষকদের কথা। তাঁর শোষণহীন সমাজ গঠনের স্বপ্নের জমিনের বড় অংশজুড়ে ছিল বাংলাদেশের কৃষক। সারা বাংলাদেশের হূদয়কে এক করার নিরলস প্রচেষ্টায় তিনি কৃষকদের চাওয়া-পাওয়াকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ মনে করতেন। গরিবহিতৈষী বঙ্গবন্ধু সেজন্যই স্বাধীন বাংলাদেশে সর্বপ্রথম কৃষকদের দিকে নজর দেন। তিনি সব সময় বলতেন, ‘আমার দেশের কৃষকেরা সবচাইতে নির্যাতিত’।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার আগে সর্বজনীন ভোটাধিকারের ভিত্তিতে সাধারণ নির্বাচনের প্রাক্কালে পাকিস্তান টেলিভিশন ও রেডিও পাকিস্তানে ‘রাজনৈতিক সমাচার’ শীর্ষক বক্তৃতামালায় আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমান ২৮ অক্টোবর ১৯৭০ সালের ভাষণে এদেশের কৃষকসমাজের অধিকার সংরক্ষণের কথা বলেছিলেন দ্ব্যর্থহীনভাবে। সেদিন তিনি উল্লেখ করেছিলেন, ‘এযাবত্ বাংলার সোনালি আঁশ পাটের প্রতি ক্ষমাহীন অবজ্ঞা প্রদর্শন করা হয়েছে। বৈষম্যমূলক বিনিয়োগ হার এবং পরগাছা ফড়িয়া-ব্যাপারীরা পাটচাষিদের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত করছে। পাটের গবেষণার ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ এবং পাট উত্পাদনের হার বৃদ্ধি করা হলে জাতীয় অর্থনীতিতে পাটসম্পদ সঠিক ভূমিকা পালন করতে পারে। বিগত সরকারগুলো আমাদের অন্যতম অর্থকরী ফসল চা, ইক্ষু ও তামাক উত্পাদনের ব্যাপারেও যথেষ্ট অবজ্ঞা প্রদর্শন করেছে। এর ফলে এসব অর্থকরী ফসল আশঙ্কাজকভাবে হ্রাস পেয়েছে। ভূমি রাজস্বের চাপে

নিষ্পিষ্ট কৃষককুলের ঋণভার লাঘবের জন্য অবিলম্বে আমরা ২৫ বিঘা পর্যন্ত জমির খাজনা বিলোপ ও বকেয়া খাজনা মওকুফ করার প্রস্তাব করেছি। আমরা বর্তমান ভূমিরাজস্ব প্রথা তুলে দেওয়ার কথা ভাবছি। অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে আমাদের বনজ সম্পদ, ফলের চাষ, গোসম্পদ, হাঁস-মুরগির চাষ সর্বোপরি মত্স্য চাষের ব্যবস্থা করতে হবে।’ (জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর নির্বাচিত ভাষণ; প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা নং- ২১৪, ২১৯, ড. এ এইচ খান সম্পাদিত, প্রকাশনায়- বাংলাদেশ কালচারাল ফোরাম, ঢাকা)।

১৯৭১ সালের ৩ জানুয়ারি ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে এক সমাবেশে জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যদের শপথবাক্য পাঠ করানোর পর বঙ্গবন্ধু যে ভাষণ দেন তাতে কৃষকদের জন্য অনেক প্রতিশ্রুতি ছিল। সেদিন বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘আমার দল ক্ষমতায় যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ২৫ বিঘা পর্যন্ত জমির খাজনা মওকুফ করে দেবো। আর ১০ বছর পর বাংলাদেশের কাউকেই জমির খাজনা দিতে হবে না। আইয়ুবি আমলে বাস্তুহারা হয়েছে বাংলার মানুষ। সরকারের খাস জমিগুলো বণ্টন করা হয়েছে ভূঁড়িওয়ালাদের কাছে। তদন্ত করে এদের কাছ থেকে খাসজমি কেড়ে নিয়ে তা বণ্টন করা হবে বাস্তুহারাদের মধ্যে। ভবিষ্যতেও সব খাসজমি বাস্তুহারাদের মধ্যে বণ্টন করা হবে এবং চর এলাকায়ও বাস্তুহারাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হবে। আমি কৃষক ও শ্রমিকদের কথা দিচ্ছি, আওয়ামী লীগ তাদের আদর্শের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করবে না। কারণ আমি বিশ্বাস করি, আওয়ামী লীগের মাথা কেনার মতো ক্ষমতা পুঁজিপতিদের নেই। এরা কেউ, এমনকি আমি নিজেও যদি বিশ্বাসঘাতকতা করি তবে আমাদের জীবন্ত কবর দেবেন। (জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর নির্বাচিত ভাষণ; প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা নং- ২৮২, ড. এ এইচ খান সম্পাদিত, প্রকাশনায়- বাংলাদেশ কালচারাল ফোরাম, ঢাকা)।

বঙ্গবন্ধু প্রণীত প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় সামাজিক ন্যায়বিচার ও দারিদ্র্য বিমোচনের তাগিদে কৃষি উন্নয়নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। স্বল্প মেয়াদে উন্নত পদ্ধতিতে চাষাবাদ, উন্নত বীজ, সেচ ও অন্যান্য কৃষিউপকরণ সরবরাহ করে এবং কৃষিঋণ মওকুফ, সার্টিফিকেট মামলা প্রত্যাহার ও খাসজমি বিতরণ করে কৃষিক্ষেত্রে উত্পাদনশীলতা ও উত্পাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে খাদ্যে স্বনির্ভরতা অর্জনের চেষ্টা করা হয়।

স্বাধীনতার পরপরই কৃষির উন্নয়ন ও সম্প্রসারণের জন্য বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে এবং নির্দেশনায় বেশকিছু নতুন প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়। ১৯৭২ সালে দেশে তুলার চাষ সম্প্রসারণ করার জন্য কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীনে তুলা উন্নয়ন বোর্ড গঠিত হয়। পুনর্গঠন করা হয় হরটিকালচার বোর্ড, সিড সার্টিফিকেশন অ্যাজেন্সি ও রাবার উন্নয়ন কার্যক্রম। সোনালি আঁশের সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত করতে প্রতিষ্ঠা করা হয় পাট মন্ত্রণালয়। বঙ্গবন্ধু কৃষি সেচব্যবস্থার উন্নয়ন, বীজ ও সার সরবরাহের প্রতিষ্ঠান বিএডিসিকে পুনর্গঠন এবং সারাদেশে এর বীজকেন্দ্র প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন ১৯৭৫ সালে। এই বিএডিসিই আধুনিক কৃষি সেচব্যবস্থার প্রচলন করে এদেশে। কৃষিতে প্রয়োজনীয় অর্থায়নের জন্য তিনি কৃষি ব্যাংক স্থাপন করেন। একইসঙ্গে কৃষি গবেষণা ছাড়া যে কৃষির উন্নতি সম্ভব নয়, বঙ্গবন্ধু তা মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেছিলেন। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার আগে এদেশে কৃষি গবেষণাধর্মী কাজ পরিচালনার জন্য তেমন কোনো সমন্বয়ধর্মী প্রতিষ্ঠান ছিল না। তাই তো ১৯৭৩ সালেই কৃষিতে গবেষণা সমন্বয়ের শীর্ষ প্রতিষ্ঠান হিসেবে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল। ১৯৭৩ সালে ১০নং অ্যাক্টের মাধ্যমে নতুন নামে পুনর্গঠন করেন বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট। তখনই ঢাকার আণবিক গবেষণাকেন্দ্রে কৃষি পারমাণবিক গবেষণা ইনস্টিটিউট অব নিউক্লিয়ার অ্যাগ্রিকালচার (ইনা) প্রতিষ্ঠা করার নির্দেশ দেন, যা ১৯৭৫ সালের গোড়ার দিকে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব নিউক্লিয়ার অ্যাগ্রিকালচার (বিনা) হিসেবে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে স্থানান্তরিত হয়। স্বাধীনতার পর জুট অ্যাক্ট-এর মাধ্যমে প্রাক্তন জুট অ্যাগ্রিকালচার রিসার্চ ল্যাবরেটরিকে বাংলাদেশ জুট রিসার্চ ইনস্টিটিউট নামে পুনর্গঠন করা হয়।

বঙ্গবন্ধু উপলব্ধি করতেন, গতানুগতিক কৃষিব্যবস্থা দ্বারা দ্রুত ক্রমবর্ধমান বাঙালি জাতির খাদ্যের জোগান নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। তাই খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের জন্য কৃষিশিল্পের ব্যাপক আধুনিকীকরণ প্রয়োজন বলে তিনি উপলদ্ধি করতেন। সেই লক্ষ্যেই অধিকতর মেধাবী শিক্ষার্থীদের কৃষিশিক্ষায় আকৃষ্ট করার জন্য ১৯৭৩ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (বাকসু) কর্তৃক বিশ্ববিদ্যালয় সমাবর্তন মঞ্চে আয়োজিত সংবর্ধনা সভায় ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়াদের মতো কৃষিবিদদের চাকরিক্ষেত্রে প্রথম শ্রেণির পদমর্যাদা ঘোষনা দেন। তাঁর ঐতিহাসিক ঘোষণার পথ ধরে আজ কৃষিবিদরা সরকারি চাকরিক্ষেত্রে প্রথম শ্রেণির গেজেটেড পদমর্যাদায় অধিষ্ঠিত। কৃষিশিক্ষা ও কৃষিবিদদের যথাযথ মূল্যায়ন এবং প্রথম শ্রেণির পদমর্যাদা প্রদানের ঐতিহাসিক ঘোষণা আজো কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ চত্বরে স্লোগান হিসেবে ‘বঙ্গবন্ধুর অবদান-কৃষিবিদ ক্লাস ওয়ান’ সোচ্চার কণ্ঠে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। জাতির জনকের দেওয়া কৃষিবিদদের ঐতিহাসিক এ সম্মানকে স্মরণীয় করে রাখতেই প্রতি বছর ১৩ ফেব্রুয়ারি জাঁকজমকপূর্ণভাবে কৃষিবিদরা দিবসটিকে ‘কৃষিবিদ দিবস’ হিসেবে পালন করে আসছেন।

১৯৭৫ সালের ২৬ মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এক বিশাল জনসভায় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেশবাসীর উদ্দেশে বলেছেন, ‘আমার দেশের এক একর জমিতে যে ফসল হয় জাপানের এক একর জমিতে তার তিনগুণ ফসল হয়। কিন্তু আমার জমি দুনিয়ার সেরা জমি। আমি কেন সেই জমিতে দ্বিগুণ ফসল ফলাতে পারব না, তিনগুণ করতে পারব না? আমি যদি দ্বিগুণও করতে পারি তাহলে আমাকে খাদ্য কিনতে হবে না। আমি চাই বাংলাদেশের প্রত্যেক কৃষক ভাইয়ের কাছে, যারা সত্যিকার কাজ করে, যারা প্যান্টপরা, কাপড়পরা ভদ্রলোক তাদের কাছেও চাই— জমিতে যেতে হবে, ডবল ফসল করুন। প্রতিজ্ঞা করুন, আজ থেকে ওই শহীদদের কথা স্মরণ করে ডবল ফসল করতে হবে। যদি ডবল ফসল করতে পারি আমাদের অভাব ইনশাআল্লাহ হবে না’। (বাংলাদেশ, প্রবন্ধ, বক্তৃতা, বিবৃতি, বাণী, নির্দেশ ও সাক্ষাত্কার; শেখ মুজিবুর রহমান, পৃষ্ঠা নং- ৮২৩, সম্পাদনায় : আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক, কাজী সিরাজুল ইসলাম ও মো. জসিম হোসেন, প্রকাশনায়- বঙ্গবন্ধু ললিতকলা একাডেমি, ঢাকা)।

স্বদেশের উন্নয়নে শিক্ষিত শ্রেণির চেয়ে কৃষকদের অবদান যে বেশি, সে কথা বলতে তিনি মোটেও দ্বিধা করতেন না। তাই তিনি বলতে পেরেছেন, ‘করাপশন আমার বাংলার কৃষকরা করে না। করাপশন আমার বাংলার মজদুর করে না। করাপশন করি আমরা শিক্ষিত সমাজ। যারা আজকে ওদের টাকা দিয়ে লেখাপড়া করেছি। (বাংলাদেশ, প্রবন্ধ, বক্তৃতা, বিবৃতি, বাণী, নির্দেশ ও সাক্ষাত্কার; শেখ মুজিবুর রহমান, পৃষ্ঠা নং- ৮০৪, সম্পাদনায় : আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক, কাজী সিরাজুল ইসলাম ও মো. জসিম হোসেন, প্রকাশনায়- বঙ্গবন্ধু ললিতকলা একাডেমি, ঢাকা)।

কৃষকের হাতে আধুনিক উপকরণ দেওয়ারও অঙ্গীকার বঙ্গবন্ধু করেছিলেন, যা বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার পূরণ করতে সক্ষম হয়েছে। কৃষকদের বাঁচানোর জন্য যে রাজনৈতিক অঙ্গীকারের দরকার তা বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা সরকারের রয়েছে। বঙ্গবন্ধুর কৃষিকপ্রীতির কথা মনে রেখেই বর্তমান সরকার কৃষকদের জন্য স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি নানা পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। ‘কৃষক বাঁচলেই দেশ বাঁচবে’ সে কথা বর্তমান নীতিনির্ধারকরা বিশ্বাস করেন। তাই গ্রামীণ অর্থনীতির পুনর্জাগরণ ঘটেছে। দেশ আজ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। স্বাধীনতার ৪৮ বছরের ব্যবধানে জনসংখ্যা আড়াই গুণ বৃদ্ধি পেলেও খাদ্য উত্পাদন বেড়েছে সাড়ে তিন গুণ। বর্তমানে দেশে চালের উত্পাদন ৩ কোটি ৭৮ লক্ষ মেট্রিক টন। একই জমিতে একাধিক ফসল চাষের দিক থেকে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে ‘রোল মডেল’। সরকারের কৃষকবান্ধব নীতিকে সমর্থন দেওয়ার জন্যই বাংলাদেশ ব্যাংক কৃষকদের ১০ টাকায় ব্যাংক হিসাব প্রদান, বর্গাচাষিসহ কৃষকদের জন্য ঋণের পরিমাণ কয়েক গুণ বাড়ানো, সারে ভর্তুকি, সুদের ভর্তুকি দিয়ে সস্তায় মসলা চাষ ও গাভী পালনে কৃষিঋণ প্রদানের নানা উদ্যোগ নিয়েছে। পাশাপাশি মোবাইল ব্যাংকিং ও অ্যাজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে কৃষক ও তাদের সন্তানরা সহজেই অর্থ লেনদেন করতে পারছে। উদ্দেশ্য, কৃষকবান্ধব বঙ্গবন্ধুর চাওয়ার আলোকে বাংলাদেশের কৃষকদেরও আধুনিক আর্থিক সেবার অংশীজন করা।

আজকের কৃষিক্ষেত্রে যে বৈচিত্র্যময় সাফল্য, বর্ধিত জনসংখ্যার খাদ্য ও পুষ্টি-নিরাপত্তাদানে সক্ষমতা এবং আগামীদিনের জলবায়ুর অভিঘাত ও বর্ধিত জনসংখ্যার খাদ্য সরবরাহের চ্যালেঞ্জ গ্রহণের সামর্থ্য, সেই ভিত্তিটাই বঙ্গবন্ধু নিষ্ঠা ও দূরদর্শিতার সঙ্গে কৃষকের প্রতি অন্তরতম মমত্বে স্থাপন করে গিয়েছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশে তাঁর স্বল্পতম শাসনকালে। বর্তমানে তাঁর অসমাপ্ত কাজটুকু সম্পন্ন করছেন তাঁরই সুযোগ্য উত্তরসূরি দেশরত্ন শেখ হাসিনা। বর্তমান সরকারের সুপরিকল্পিত কৃষিনীতি এবং মানসম্পন্ন উপকরণ সরবরাহের ফলে চাল উত্পাদনে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে চতুর্থ স্থানে, সবজি উত্পাদনে তৃতীয়, মাছ চাষে তৃতীয়, আম উত্পাদনে সপ্তম এবং আলু উত্পাদনে অষ্টম স্থানে রয়েছে। নিজেদের চাহিদা মিটিয়ে এখন অন্য দেশেও চাল রপ্তানির সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। শাকসবজি ও ফলমূল রপ্তানিতেও আমরা দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছি। আমাদের কৃষি গবেষণা উদ্ভাবিত উন্নত ধানের জাত এশিয়া ও আফ্রিকার অন্তত ২০টি দেশে আবাদ হচ্ছে। সর্বোপরি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর গতিশীল নেতৃত্বে উন্নয়নের ক্রমবর্ধমান ধারায় বাংলাদেশের অব্যাহত সাফল্য এখন দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বহির্বিশ্বেও বিকিরণ করছে।

সর্বসাধারণের মৌলিক চাহিদা ও প্রাপ্য অধিকার পূরণ করে উন্নয়নের যে দৃষ্টান্ত বর্তমান সরকার স্থাপন করেছে তা আজ দিনের আলোর মতোই স্পষ্ট। বঙ্গবন্ধুর রেখে যাওয়া পথ ধরেই সমৃদ্ধ আগামীর পথে মানননীয় প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে বাংলাদেশের এই সাফল্যময় অভিযাত্রা অব্যাহত থাকবে এবং অচিরেই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের ‘সোনার বাংলা’ প্রতিষ্ঠিত হবে।

লেখক : কৃষিবিদ সাজ্জাদুল হাসান, সচিব, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়

তথ্যসূত্রঃ দৈনিক ইত্তেফাক, ১৫ই আগস্ট, ২০১৯