বিলাতি ধনিয়া চাষ পদ্ধতি

বিলাতি ধনিয়া চাষ পদ্ধতি

বিলাতি ধনিয়া বা বাংলা ধনিয়া বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব পার্বত্য অঞ্চলের একটি অন্যতম লাভজনক অর্থকরী মসলা ফসল। এ ধনিয়ার পাতা ও কচি পুষ্পপদণ্ড একাধারে সবজি, সালাদ এবং মসলা হিসেবে ব্যবহৃত হয়। বিলাতি ধনিয়া প্রধানত খরিফ মৌসুমের ফসল। এর পাতা ও কচিকাণ্ড পাকস্থলীর প্রদাহরোধী এবং এনালজেসিক হিসেবে কাজ করে। এটি ক্ষুধা উদ্রেককারী, হজমশক্তি বাড়ায়, পাকস্থলীর ব্যাথা উপশম, ডাইরিয়া, শাস, পোকা সাপের কামড় কমায়, কোলিক সমস্যা দূর করে এবং গ্যাস উদগীরন কমায়। এ ফসলটির পুষ্টি গুণাগুণ অত্যন্ত উচ্চমানের। এর পাতা ও কাণ্ডে প্রচুর পরিমাণে ক্যালসিয়াম, আয়রন, ক্যারোটিন এবং রিবোফ্লাভিন রয়েছে। এসব উদ্বায়ী সুগন্ধি তৈল জাতীয় পদার্থ এবং এসিড জাতীয় উপাদান সংগ্রহ করে উচ্চমুল্যর সুগন্ধি ও ভেষজ ওষুধ তৈরি করা যায়।

নাতিশীতোষ্ণ থেকে উষ্ণ ও আর্দ্র আবহাওয়া বিলাতি ধনিয়া চাষের জন্য উপযোগী। অত্যাধিক শীতল আবহাওয়ায় (<১০০সে) এর বৃদ্ধি কমে যায়। বিলাতি ধনিয়া প্রখর সূর্যালোকের চেয়ে ছায়াতে বা হালকা বিক্ষেপিত (৫০-৭৫%) আলোতে ভাল পাতা উৎপাদন করে। প্রায় সব ধরনের মাটিতেই বিলাতি ধনিয়া জন্মে। এ ধনিয়া চাষের জন্য প্রচুর জৈব পদার্থ সমৃদ্ধ সুনিষ্কাশিত দোআঁশ থেকে এঁটেল দোআঁশ মাটি বেশি উপযোগী।বসতবাড়ির বাগানে বা ছাদে টবেও চাষ করা সম্ভব। বীজ খুবই ক্ষুদ্রাকৃতির (বালির দানার মত ছোট) হওয়ায় বড় আকারের ঢেলার মধ্য দিয়ে তাদের গজানো সম্ভব নয়। এজন্য মটর দানা বা মার্বেলের চেয়ে বড় আকারের ঢেলা থাকা বাঞ্ছনীয় নয়।
 নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি মাস বিলাতি ধনিয়ার বীজ বপনের উত্তম সময়। মাটিতে পর্যাপ্ত রস থাকলে মার্চ মাস পর্যন্ত বপন করা যেতে পারে।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের মসলা গবেষণা কেন্দ্র থেকে ২০১৩ সালে বারি বিলাতি ধনিয়া-১ নামে একটি জাত অনুমোদিত হয়েছে। এ জাতটি বাংলাদেশের আবহাওয়া উপযোগী ও উচ্চফলনশীল (প্রতি হেক্টরে পাতা ৩০-৫০ টন এবং বীজের ফলন ৪০০-৫০০ কেজি)
বপনের পূর্বে বেশি পরিমাণ পানিতে বীজ ৮ ঘণ্টা ভিজিয়ে রাখতে হবে এবং ভিজানো পানি চায়ের লিকারের মত লালচে রঙ ধারণ করে। ঘন ছাঁকনি বা পাতলা কাপড় দিয়ে বীজ ছেঁকে পানি ফেলে দিয়ে ৪ ঘণ্টা ঝুলিয়ে রাখতে হবে। পরে একই পদ্ধতিতে আবার ভিজাতে হবে এবং ছাঁকতে হবে। এভাবে ৬-৮ বার বিলাতি ধনিয়ার বীজ (৭২-৯৬ ঘণ্টা) প্রাইমিং করে গজানোর হার দ্বিগুন করা যায়।
বিলাতি ধনিয়া পাতা জাতীয় ফসল হওয়ায় এর জন্য ইউরিয়া ও পটাশ জাতীয় সার বেশি গুরুত্ব¡পূর্র্ণ। বীজ বপনের পূর্বে শতাংশ প্রতি ৮০ কেজি পচা গোবর বা আবর্জনা পচা সার ২০০ গ্রাম ইউরিয়া, ৮০০ গ্রাম টিএসপি ও ৮০০-১০০০ গ্রাম এমওপি শেষ চাষের সময় বীজ বপনের ৪/৫ দিন পূর্বে জমিতে মিশিয়ে দিতে হবে। চারা গজানোর ৩০ দিন পর থেকে ১ মাস অন্তর অথবা প্রতি দুইবার ফসল সংগ্রহের পর প্রতি শতাংশে ২০০ গ্রাম হারে ইউরিয়া উপরি প্রয়োগ করতে হবে। তবে ইউরিয়া উপরি প্রয়োগের পরপরই হালকা ঝরনা সেচ দিতে হবে। এতে সার ভালভাবে মাটিতে শোষিত হবে আর পাতায় লেগে থাকা ইউরিয়া দূর হয়ে পাতা পুড়ে যাওয়ার হাত থেকে ফসল রক্ষা পাবে।বিলাতি ধনিয়ার পাতা নরম, চওড়া ও মসৃণ হওয়ার জন্য জমিতে ছাউনী দেওয়া একান্ত প্রয়োজন। অন্যথায় প্রখর সূর্যালোকে পাতা শক্ত ও কাঁটাযুক্ত হয়ে যায় এবং দ্রুত ফুল উৎপাদনের ফলে ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে যায়। বিলাতি ধনিয়ার জন্য সব সময় পর্যাপ্ত রস থাকতে হবে আবার গাছের গোড়ায় পানি জমতে দেওয়া যাবে না। এজন্য ঝরনা পদ্ধতিতে মাটির অবস্থা বুঝে (৪-৭ দিন পরপর) হালকা সেচ দেওয়া ভাল।

(সূত্র: বিএআরআই)